মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন জনপদ সন্দ্বীপ। এই উপজেলার সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে সম্রাট খীসা যোগ দেন ২০২১ সালের ৩০ ডিসেম্বর।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর দ্বীপবাসীর দুর্যোগে-দুর্ভোগে ছুটেছেন জনপদে জনপদে। দাঁড়িয়েছেন অসহায় মানুষের পাশে।
সাধ্যমতো করেছেন সহযোগিতা। প্রবল ঘূর্ণিঝড়েও জীবনমায়া ত্যাগ করে গিয়েছেন বেড়িবাঁধে। সেখানে থাকা লোকজনকে সরিয়ে নিয়েছিলেন নিরাপদ আশ্রয়ে।
এছাড়া উপজেলার উন্নয়নে এঁকেছেন নির্দিষ্ট ছক। জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে নিয়েছেন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম। নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন করে দূর করেছেন জনসাধারণের দুর্ভোগ। সবমিলিয়ে উপজেলার বাসিন্দাদের আপন করে নিয়েছিলেন সম্রাট খীসা। তাই এই দ্বীপকে দেশবাসীর কাছে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতেও সচেষ্ট ছিলেন তিনি।
সন্দ্বীপের আমানউল্যা ইউনিয়নের অবহেলিত গ্রাম চেউরিয়া। যেখানে ৭০ থেকে ৮০ পরিবারের বসবাস। বর্ষা নামলেই দুই কাপড়ে বের হতো এ গ্রামের মানুষেরা। ভেজা কাপড় খুলে শুকনো কাপড় পড়ে স্কুল-কলেজে যেত শিক্ষার্থীরা। চলাচলের প্রধান সড়কে জমে থাকতো কোমর সমান পানি। সেই সড়ক ঠিক করা যেত না মামলা জটিলতার কারণে।
আমানউল্যা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম বলেন, অবহেলিত সন্দ্বীপের মানুষের জন্য তিনি যা করেছেন তা আমাদের অজীবন স্মরণে থাকবে। দুর্যোগকালীন সময়ে তার যে পদক্ষেপ সেটি কখনো ভূলবার নয়। বিশেষ করে শতবছর ধরে চেউরিয়া ইউনিয়নের মানুষ একটি সড়কের জন্য কষ্ট পাচ্ছিলেন। তিনি সমস্ত জটিলতা দূর করে সেখানে ৮০০ ফুট লম্বা সড়ক নির্মাণ করে দিয়ে সাড়া পেলেছেন। শেখ রাসেলের ম্যূারাল, শিশু পার্ক, সন্দ্বীপ ঘাটে যাত্রী ছাউনি নির্মাণ করেছেন তিনি।
মুছাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের নাদিম বলেন, সম্রাট খীসার দায়িত্বকালীন সময়ে কয়েকটি ঘূর্ণিঝড় হয়েছে। প্রতিটা ঘূর্ণিঝড়ের সময় তিনি লোকজনকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে বেড়িবাঁধে যেতেন। আরেকটা বিষয়, তিনি এই দ্বীপকে এবং এখানকার মানুষকে ভালোবেসেছিলেন। একারণে তিনি সন্দ্বীপকে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে যেতেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দায়িত্বকালীন সময়ে সম্রাট খীসা জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্মাণ করেছেন ব্রিজ-কালভার্ট এবং সংস্কার করেছেন রাস্তাঘাট। তিনি উপজেলা কমপ্লেক্সে মুজিব কিল্লা, শেখ রাসেল শিশু পার্ক, শেখ রাসেল ম্যুরাল, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব উপজেলা ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প প্রদর্শনী কেন্দ্র এবং সেবাগ্রহীতাদের জন্য বিশ্রামাগার স্থাপন করেছেন। এছাড়া তার প্রচেষ্টায় বাস্তবায়িত হয়েছে দীর্ঘাপার আশ্রয়ন প্রকল্প, উড়িরচরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাংলো এবং গুপ্তছড়া ঘাটে স্বাগতম গেট নির্মাণ করেন।
দায়িত্বকালীন সময়ে যৌতুক, বাল্যবিবাহ ও যৌন হয়রানি রোধ, অবৈধ দখলদার উচ্ছেদসহ উপজেলার সকল অফিসে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করেছেন ইউএনও সম্রাট খীসা। তিনি শিক্ষার্থীদের ধুমপান ও মাদকমুক্ত রাখতে বঙ্গবন্ধু আন্ত:জেলা গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজন করেছেন।
স্থানীয়রা জানান, ইউএনও সম্রাট খীসা মানসিক ও শারীরিক প্রতিবন্ধী, ভিক্ষুক, শিক্ষার্থীসহ অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি অনেক সময় ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষার্থীদেরকে তিনি অর্থনৈতিক সহযোগিতা করে লেখাপড়া করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক সন্দ্বীপ শাখার ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান বলেন, রাত ১২ টা, ১টা, ২টা যখনই উনাকে ফোন দিতাম, সঙ্গে সঙ্গে রেসপন্স করতেন। এরপর সাধ্যমতো সহযোগিতা করতেন। তিনি আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখার ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। দক্ষ হাতে নিয়ন্ত্রণের ফলে তার আমলে উপজেলায় হয়নি কোনো ধরনের দাঙ্গা-হাঙ্গামা। তিনি তিনটি নির্বাচন শান্তিপূর্ণ সমাপ্ত করেছেন। এছাড়া তিনি উপজেলায় অফিসার ক্লাব স্থাপন, অফিসারদের আবাসন ব্যবস্থা উন্নত এবং খেলাধুলার ব্যবস্থা করেছেন। দায়িত্বের বাইরে গিয়ে তিনি আমাদের কৃষি লোন বিতরণ ও উত্তোলনের ব্যাপারে সহযোগিতা করেছেন।
ইউএনও সম্রাট খ্রীসা বলেন, আরও কিছু কাজ বাকি ছিলো তা শেষ করে দ্বীপবাসীর সঙ্গে অনুভূতিটা উপভোগ করে যাওয়ার অনেক ইচ্ছা ছিলো। তবে সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক হঠাৎ বদলি হয়ে যাওয়ায় চলে যেতে হচ্ছে। সন্দ্বীপবাসীর প্রতি সবসময়ই ভালোবাসা থাকবে। এখানকার মানুষের আন্তরিকতা আর ভালোবাসার ফলে অল্পদিনেই সন্দ্বীপকে আমি আমার নিজের করে নিয়েছিলাম।