অঘোষিত সামরিক শাসনের অধীনে থাকা পাকিস্তানে বিরোধীদের দমনে গণগ্রেফতার, গুম, খুন ও নির্যাতন নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো আওয়াজই তুলছে না। অথচ বিপরীতে ‘যারা নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করবে তাদের মার্কিন ভিসা দেয়া হবে না’ এমন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বাংলাদেশে গণতন্ত্র রক্ষার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে দেশটি। দুই দেশের প্রতি এমন বৈপরিত্যপূর্ণ আচরণকে ঠিক কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়?
সংক্ষেপে বলতে গেলে, সবসময়ই যুক্তরাষ্ট্রের এ গণতান্ত্রিক অধিকার ফেরি করে বেড়ানোর বিষয়টি পক্ষপাতদুষ্ট। এর সঙ্গে সবসময়ই ভূরাজনৈতিক ফায়দা জড়িত থাকে। এ ক্ষেত্রে স্বার্থ হাসিলে নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য মার্কিন আইনপ্রণেতাদের কাছে গণতন্ত্রের প্রচার একটি বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশের ওপর নতুন ভিসা নীতি আরোপের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে দুটি বিষয় বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে। একটি হলো, বাংলাদেশি রাজনীতিবিদদের আত্মীয়দের বড় একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করে। এমনকি খোদ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলেও যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ডধারী। অপরটি হলো, বাংলাদেশের উৎপাদিত পণ্যের বড় বাজার হলো পশ্চিমা বিশ্ব। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।
‘বাংলাদেশে ২০২৪ সালের নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়া নিশ্চিত করাই যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য’ – মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের এমন বক্তব্যের দ্বিমত করবে খুব কম সংখ্যক মানুষই। যাহোক, ‘গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য দায়ী বা জড়িত’ ব্যক্তিদের ভিসা বন্ধ করার জন্য তার যে হুমকি তা এ লক্ষ্য প্রচারের জন্য খুব সামান্যই ইতিবাচক এবং তাতে হিতে বিপরীতও হতে পারে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা ও প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন সরকার পতনের কৌশল বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। গত এপ্রিলে তিনি জাতীয় সংসদে বলেছিলেন, ‘তারা গণতন্ত্রকে উপড়ে ফেলে এমন একটি সরকার বসাতে চায়, যার গণতান্ত্রিক বৈধতা থাকবে না। এটি হবে খুবই অগণতান্ত্রিক আচরণ।’
ইসলামপন্থিদের প্রবল অপছন্দের পরও শেখ হাসিনা বাংলাদেশে ২০০৯ সাল থেকে ধর্ম নিরপেক্ষ সরকার পরিচালনা করে আসছেন। দেশে তিনি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করেছেন। তবে সম্প্রতি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে দেশের অর্থনীতি কিছুটা ঝাঁকি খেয়েছে।
বাংলাদেশের চমৎকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ঠিক বিপরীত অবস্থা পাকিস্তানের। দেশটি বর্তমানে দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। ইতিবাচক এত দিক থাকার পরও বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র আয়োজিত গণতন্ত্র সম্মেলনে ডাকা হয়নি। অথচ বাইডেন প্রশাসন আয়োজিত দুটি গণতন্ত্র সম্মেলনে পাকিস্তানকে ডাকা হয়েছিল। যদিও দেশটি একবারও যোগ দেয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র স্বল্পমেয়াদী ভূরাজনৈতিক বিবেচনায় পাকিস্তানকে অব্যাহত সমর্থন দিয়েছে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে অভিযোগ এনে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে বঞ্চিত করেছে। ২০২১ সালে বাইডেন প্রশাসন বাংলাদেশের এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং এর ছয় শীর্ষ সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় মানবাধিকার লঙ্ঘনের এবং যুক্তরাষ্ট্রে তাদের সম্পদ জব্দ করা হয়।
গত বছরের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস কট্টর ইসলামপন্থিদের সঙ্গে জোট গড়া দেশের সবচেয়ে বড় বিরোধীদল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সঙ্গে পুলিশের সহিংসতার তদন্ত দাবি করেন। এবং সম্প্রতি ব্লিঙ্কেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেনের কাছে ‘গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং ভয় দেখানোর বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর।
ব্লিঙ্কেন ঘোষিত ভিসা নিষেধাজ্ঞা পরিষ্কারভাবে শেখ হাসিনা সরকারের সদস্যদের লক্ষ্য করে। যার মধ্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য এবং অন্যান্য নিরাপত্তা কর্মকর্তারা রয়েছেন। তবে নতুন নীতিতে বিরোধীদলগুলোর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বিদেশী কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ সাধারণত প্রতীকী উদ্দেশ্য ছাড়া আর কিছু নয় এবং এটি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত করে। এমনকি অনেক সময় এটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতিও বয়ে আনতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে আমার চীনের কথা বলতে পারি। চলতি মাসের শুরুতে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল লি শ্যাংফুর সঙ্গে বৈঠক করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু চীন তাতে সাড়ায় দেয়নি। বেইজিং স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয় লি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তালিকাভুক্ত। ফলে তিনি মার্কিন সরকারের কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করবেন না।
একইভাবে মিয়ানমার, ইরান, বেলারুশ এবং কিউবার মতো দেশগুলোর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। যেসব দেশের নেতা ও কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু এসব নিষেধাজ্ঞা কোনো রাজনৈতিক ফলাফল বয়ে আনেনি। মার্কিন প্রভাবের আপেক্ষিক ক্ষয় এবং পশ্চিম থেকে প্রাচ্যে বৈশ্বিক ক্ষমতার চলমান স্থানান্তর মার্কিন নিষেধাজ্ঞাগুলোকে আরও কম কার্যকর করে তুলছে। যাইহোক, পশ্চিমারা এখনও বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামো নিয়ন্ত্রণ করছে এবং ডলার এখনো বিশ্বের প্রাথমিক রিজার্ভ মাধ্যম হিসাবে রয়ে গেছে। তাই নিষেধাজ্ঞা এখনও মার্কিন নীতিনির্ধারকদের কাছে একটি আকর্ষণীয় বিকল্প।
ঢাকার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের যে কঠোর অবস্থান তা খুব সামান্যই অর্থবহ। কারণ, হাসিনা সরকার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার অন টেররের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারত এবং এশিয়ার নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারত। অথচ বিপরীতে এখন, দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কেই টান পড়েছে। গত মাসে শেখ হাসিনা ওয়াশিংটন সফরে গিয়ে বিশ্ব ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করলেও তার সঙ্গে বাইডেন প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়নি।
যাইহোক, চলতি মাসের শুরুতে সিঙ্গাপুরে এক সম্মেলনে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন ঘোষণা দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে চীনা হুমকি ও জবরদস্তির মুখে পিছু হটবে না। কিন্তু তারাই আবার বাংলাদেশের বেলায় হুমকি এবং জবরদস্তির পথ বেছে নিয়েছে। কিন্তু তা বাংলাদেশে মার্কিন স্বার্থকে খুব সামান্য এগিয়ে নেবে।
উপরন্তু, বিশ্বের সপ্তম শীর্ষ জনবহুল দেশকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সাহায্য করার বদলে তার ওপর জবরদস্তি ও বলপ্রয়োগের চেষ্টা করলে তা বাংলাদেশিদের মনে ১৯৭১ সালের বেদনাদায়ক স্মৃতি মনে করিয়ে দেবে। সে সময় বাংলাদেশ যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার বিপরীতে ইসলামাবাদের শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের চেষ্টা করছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কী ছিল তা আবারও জাগরূক হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশিদের মনে। তো এতসব কিছু বিবেচনায় এখন ওয়াশিংটনের অবস্থান কী হবে?
(জাপানি সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়া থেকে অনূদিত। লেখক ব্রহ্ম চেলানি নয়াদিল্লির সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের কৌশলগত অধ্যয়নের অধ্যাপক এবং ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক উপদেষ্টা। তিনি ‘ওয়াটার: এশিয়াস নিউ ব্যাটলগ্রাউন্ড’সহ মোট ৯টি বইয়ের লেখক।)