পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বাড়ির আশপাশ থেকে পুলিশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। তার সমর্থকদের তীব্র বাধার মুখে খানকে গ্রেপ্তার না করেই চলে আসতে বাধ্য হয় পাকিস্তান পুলিশ। এরপরই বেরিয়ে এসে সমর্থকদের অভিবাদন জানিয়েছেন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ দলের প্রধান। এ খবর দিয়েছে বিবিসি।
খবরে জানানো হয়, তার বাড়ির সামনে থাকা মানুষের বিশাল সমাবেশের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছেন ইমরান খান। তাদের সঙ্গে ছবিও তুলেছেন তিনি। তাকে গ্রেপ্তারে লাহোরের জামান পার্ক এলাকায় টানা দুইদিন চেষ্টা চালিয়ে গেছে পাক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। কিন্তু জনতার বাধায় শত চেষ্টার পরেও ব্যর্থ হয়েছে তারা।
পুলিশ রাতভর টিয়ারশেল হামলা চালিয়েছে ইমরান সমর্থকদের ওপরে। এক ভিডিওতে ইমরান খানকে দেখা গেছে গ্যাস মাস্ক পরে সমর্থকদের মধ্যে হাজির হয়েছেন। এক পুলিশ কর্মকর্তা বিবিসিকে জানান যে, গ্রেপ্তার অভিযান আপাতত ক্ষান্ত দেয়া হয়েছে। পাঞ্জাবের তথ্যমন্ত্রী আমির মীর জানান, আদালত থেকেই খানকে গ্রেপ্তারের আদেশ বাতিল করা হয়েছে।
ওই এলাকার পাশেই একটি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেটির কথা মাথায় রেখে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে আদালত। তাকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে কার্যত গোটা এলাকা অচল হয়ে গিয়েছিল। পাকিস্তান সুপার লীগের ফাইনাল ম্যাচের পর আবারও ইমরানকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলতে পারে।
পাকিস্তানে ২০০৯ সালে বন্দুকধারীরা শ্রীলঙ্কা জাতীয় ক্রিকেট দলের উপর হামলা চালায়। এরপর থেকে দেশটিতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কার্যত বন্ধ হয়ে আছে। যদিও সম্প্রতি আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়রা ফিরতে শুরু করেছে দেশটির পিএসএল টুর্নামেন্ট খেলতে। এখন পাকিস্তান চাইছে, যেভাবেই হোক এই টুর্নামেন্টকে নিরাপদ রাখতে হবে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে একজন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, পিএসএলের নিরাপত্তা নিশ্চিতের কোনো বিকল্প আমাদের কাছে নেই।
এদিকে বুধবার, লাহোর হাইকোর্ট পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছে যে, গ্রেপ্তারি পরোয়ানার বৈধতা নিয়ে শুনানির ফলাফল না হওয়া পর্যন্ত ইমরান খানকে গ্রেপ্তার স্থগিত রাখতে হবে। অফিসার এবং আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের এরপর ইমরান খানের বাড়ির এলাকা ছেড়ে আসতে দেখা গেছে। এখন আস্তে আস্তে সেখান থেকে সড়ক অবরোধগুলোও সরে যাচ্ছে। আদালতের ওই ঘোষণার পর ইমরান খান বাড়ির বাইরে হাজির হন এবং সমর্থকদের সঙ্গে কথা বলেন। তার পিটিআই দলের টুইটার অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা হয়েছে, ইমরান খানের ক্ষতি করার জন্য যে পুলিশ ও রেঞ্জারদের পাঠানো হয়েছে, তাদের জনগণ হটিয়ে দিয়েছে।
৭০ বছর বয়সী খান গত বছরের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন। তিনি অফিসে থাকাকালীন রাষ্ট্রীয় উপহার বিক্রি করার অভিযোগের মুখোমুখি হন। যদিও তার দাবি, এই মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
বুধবার ইমরান খানের বাড়ির বাইরের রাস্তাগুলিতে ব্যাপক ধ্বংসাবশেষ এবং ভাঙা ব্যারিকেড দেখা গেছে। তার সমর্থকরা লাহোরের প্রধান সড়কগুলোতে জড়ো হয়েছিল। তারা দিনরাত ইমরানের নাম নিয়ে স্লোগান দিতে থাকে। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ সদস্যরা টিয়ার গ্যাস এবং জলকামান নিক্ষেপ করে। এর জবাবে পুলিশকে টার্গেট করে ভিড়ের মধ্য থেকে ইট-পাথর ছোঁড়া শুরু হয়।
পুলিশ ইমরানকে গ্রেপ্তার করার জন্য জোর করে তার বাড়িতে প্রবেশ করার চেষ্টা করে। তবে সমর্থকরা তাদের আটকে দেয়। পিটিআই সমর্থক ওয়াকার খান বিবিসিকে বলেন, আমি এমন বর্বরতা কখনো দেখিনি, এটাই আমাকে স্তম্ভিত করেছে। মঙ্গলবারের সংঘর্ষের কথা স্মরণ করে তাজিন নামে এক নারী বলেন, আমরা কি মানুষ নই? এটা কেমন দেশ? আমার চারপাশের মানুষ শ্বাস নিতে পারছে না।
ইমরান খান দাবি করেছেন যে, নিরাপত্তার উদ্বেগের কারণে তিনি আদালতে হাজির হননি কারণ এর আগে সেখানে দুটি জঙ্গি হামলা হয়েছিল। তিনি এর আগে বিবিসিকে বলেছিলেন যে, পুলিশের তাকে গ্রেপ্তার করার কোন কারণ নেই। কারণ তিনি শনিবার পর্যন্ত জামিন নিয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন, সরকার আগের ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর তাকে কারাগারে রাখতে বদ্ধপরিকর।
তিনি বলেন, আসন্ন নির্বাচনে তার দল যাতে অংশ না নেয় সেজন্য কর্তৃপক্ষ তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা করছে। তবে কারাগারে থাকলেও তার দলের জয় কেউ ঠেকাতে পারবে না বলে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন ইমরান খান। যদিও মন্ত্রী মরিয়ম আওরঙ্গজেব বলেছেন যে, এই পদক্ষেপের সাথে নির্বাচনের কোনও সম্পর্ক নেই এবং পুলিশ কেবল আদালতের আদেশ মেনে চলছে। তিনি দাবি করেন, ইমরান খান গ্রেফতার এড়াতে এবং অশান্তি ছড়াতে তার দলীয় কর্মী, নারী ও শিশুদের মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন।
প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে অপসারিত হওয়ার পর থেকে ইমরান এখন পাকিস্তান সরকার ও দেশটির সেনাবাহিনীর একজন সোচ্চার সমালোচক। তিনি এই বছরের শেষের দিকে নির্বাচনের আহ্বান জানিয়ে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়ে দেশ সফর করেছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের উপর বিক্ষোভের মাধ্যমে চাপ অব্যাহত রেখেছেন ইমরান খান। নভেম্বরে তাকে হত্যার চেষ্টা হয়। ইমরান খান এই চেষ্টার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে দায়ী করেছেন।