বাংলাদেশের গার্মেন্টস এবং টেক্সটাইল নির্মাতা ডিবিএল গ্রুপের সামনে বড়সড় হুমকির কারণ ‘জলবায়ু পরিবর্তন, যা তারা উপেক্ষা করতে পারে না। ব্যবসার প্রধান কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল্লাহর ঢাকার কারখানায় প্রায় ৩৫,০০০ কর্মী কাজ করেন। তিনি বলছেন গত বছর তাপপ্রবাহের কারণে তাঁর কারখানায় উৎপাদনশীলতা হ্রাস পেয়েছে, শুধু তাই নয় নদীর তীরে কাপড়-রঞ্জনের কারখানাগুলি বন্যার ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছে। গুলশান জেলায় ডিবিএলের অফিস ভবনে বসে তিনি বার বার সতর্ক করে বলছিলেন পাকিস্তানের মতো বিধ্বংসী বন্যা বাংলাদেশের শিল্পের জন্য বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। ডিবিএল এমন একটি কোম্পানি – যার বহুজাতিক ক্লায়েন্টদের মধ্যে রয়েছে এইচএন্ডএম, ওয়ালমার্ট-জর্জ এবং পুমা। তারা গ্লোবাল ওয়ার্মিংকে ঠেকাতে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। জেনারেটর থেকে তাপ পুনরুদ্ধার করে জল গরম করার জন্য তারা যেমন প্রযুক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে তেমনি কর্মক্ষেত্রে চরম তাপের প্রভাব কমাতে গাছ লাগিয়ে সেই উত্তাপ শোষণের ব্যবস্থা করেছে। তবুও, পোশাক শিল্প জুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনকে মোকাবেলার করার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থার অভাব রয়ে গেছে। একথা বলছেন বাংলাদেশের সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস)-এর জলবায়ু বিশেষজ্ঞ আহমেদ জুলফিকার রহমান। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপ বৃদ্ধির ফলে দৈনিক কাজের সময় গড় ২% থেকে ২.৫% কমতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি সাম্প্রতিক গবেষণা অনুসারে – বাংলাদেশের পোশাক কারখানায় প্রায় ৪.৫ মিলিয়ন লোক কাজ করেন, যার মধ্যে ৬০ শতাংশ নারী।
গ্রীষ্মে অত্যধিক তাপের কারণে শ্রমিকরা প্রায়শই মাথাব্যথা, ক্লান্তি বা বমি বমি ভাবের মতো উপসর্গগুলি অনুভব করেন। যার জেরে উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়। উত্তর ঢাকায় এইরকম একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন বছর সাতাশের এক মা শোপনা আক্তার। ক্রমবর্ধমান গরমের কারণে তিনি মাথা ঘোরা এবং দুর্বল বোধ করেছিলেন। গত মাসে গরমের কারণে তিনি রীতিমত অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি নিজের শরীরের কথা ভেবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কারণ তিনি অর্থ উপার্জন না করলে ঘরে তাঁর ৭ বছরের সন্তানটি অভুক্ত থাকবে। প্রবলের দাবদাহ কমাতে গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা কারখানায় পর্যাপ্ত বায়ুচলাচল এবং শীতলকরণের ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিচ্ছেন, সেই সঙ্গে কারখানায় শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা রাখতে বলছেন। ফিনিশের একটি বেসরকারী সংস্থা ফিনওয়াচের একটি জানুয়ারির রিপোর্ট অনুসারে গার্মেন্টস শ্রমিকদের অধিকাংশই দুর্যোগ-প্রবণ গ্রামীণ এলাকা থেকে শহরে কর্মক্ষেত্রে এসে ক্রমবর্ধমান গরম এবং আর্দ্র আবহাওয়ার সম্মুখীন হন। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় স্বয়ংক্রিয়তা এবং পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলি তাদের সরবরাহ চেইনকে আরও কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টার কারণে পোশাক খাতে কর্মসংস্থান সঙ্কুচিত হলে বাংলাদেশের বেশিরভাগই স্বল্প-দক্ষ শ্রমিকরা বিপদে পড়বেন। বিকল্প চাকরি খোঁজার জন্য তাঁদের লড়াই করতে হবে।
সবুজ সংস্কার
জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব থেকে তাদের কর্মীদের এবং ক্রিয়াকলাপকে রক্ষা করার জন্য মূলত বিশ্বের বড় ব্র্যান্ডগুলি বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলিকে ‘সবুজ উৎপাদন পদ্ধতি’ (greener production methods) অবলম্বন করার জন্য চাপ দিচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় গন্তব্যস্থল, জুলাই ২০২২ থেকে জানুয়ারি ২০২৩ পর্যন্ত ১৩.৭৩ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পোশাক আমদানি করেছে তারা। EU জানিয়ে দিয়েছে – জলবায়ু সংক্রান্ত পদক্ষেপের সাথে সাথে, কোম্পানিগুলিকে তাদের প্রত্যক্ষ ক্রিয়াকলাপের পাশাপাশি সরবরাহ চেইনের কারণে সৃষ্ট কার্বন নির্গমন (যা “স্কোপ ৩” নির্গমন নামে পরিচিত) সম্পর্কে রিপোর্ট করতে হবে। এক বছর আগে, ইউরোপীয় কমিশন টেকসই টেক্সটাইলের জন্য একটি কৌশল প্রকাশ করেছি। বিশ্বব্যাপী টেক্সটাইল সেক্টরে পুনর্ব্যবহার এবং সবুজ পদক্ষেপগুলিকে উৎসাহিত করার ওপর তারা জোর দিয়েছিলো। বাংলাদেশের পোশাকের সবচেয়ে বড় ক্রেতা সুইডেন-ভিত্তিক বহুজাতিক ফ্যাশন সংস্থা H&M এই ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা ২০২১ সালে বাংলাদেশ থেকে ৩.৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পোশাক কিনেছে। H&M মুখপাত্র ইনিগো সেনজ মায়েস্টার বলেছেন যে কোম্পানির নির্গমনের সবচেয়ে বড় উৎস হল কাঁচামাল এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া। তিনি ইমেলের মাধ্যমে জানাচ্ছেন -” ভার্জিন মেটিরিয়ালের উপর নির্ভরতা হ্রাস এবং পুনর্ব্যবহৃত উপকরণগুলির ব্যবহার সর্বাধিক করার ওপর আমরা জোর দিচ্ছি। ”বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (IFC) একটি প্রোগ্রাম পরিচালনা করে যা বাংলাদেশের কারখানাগুলিকে তাদের পরিবেশগত এবং জলবায়ু প্রভাব রোধে ব্যবস্থা নিতে সহায়তা করে। IFC বাংলাদেশের অপারেশন অফিসার নিশাত শহীদ চৌধুরী বলেছেন, ক্লিনার টেক্সটাইল কর্মসূচি ৪০০ টিরও বেশি কারখানাকে প্রায় ১ মিলিয়ন মানুষের বার্ষিক চাহিদার সমান পানি ব্যবহার কমাতে এবং ১ লাখেরও বেশি গাড়ি রাস্তা থেকে সরিয়ে নেওয়ার সমান গ্রিনহাউস গ্যাস কমাতে সাহায্য করেছে। বাংলাদেশের ১৮০টিরও বেশি পোশাক কারখানা LEED সার্টিফিকেশন পেয়েছে, যে কোনো দেশের পোশাক শিল্পের জন্য যা সর্বোচ্চ।
শ্রম সেক্টর
এক দশক আগে মারাত্মক রানা প্লাজা বিপর্যয়ের স্মৃতি আজো টাটকা। সেই দুর্ঘটনায় ঢাকা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি কমপ্লেক্স ধসে ১,১৩০ জনেরও বেশি শ্রমিক নিহত হয়েছিল। তখন থেকেই শিল্পের সরবরাহ চেইনে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার জন্য একটি অভিযান শুরু হয়। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির “ম্যাপড ইন বাংলাদেশ” উদ্যোগটি দেশব্যাপী ৩,৭০০টিরও বেশি পোশাক কারখানাকে ট্র্যাক করেছে। তারা একটি উন্মুক্ত তথ্য ব্যবস্থা প্রদান করেছে যা ব্র্যান্ডগুলিকে গাইড করতে পারে কীভাবে কারখানাগুলি নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যাগুলির মোকাবেলা করছে। মানচিত্রের নির্মাতারা এখন পরিবেশের কথা মাথায় রেখে কাজ করছেন। সরবরাহকারীদের একটি তালিকা তৈরী করা হয়েছে যাদের গ্লোবাল রিসাইকেল স্ট্যান্ডার্ড এবং নর্ডিক ইকোলাবেলের মতো সবুজ শংসাপত্র রয়েছে। তা সত্ত্বেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে সবুজ পোশাক খাতের জন্য ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক চাপ শ্রমিকদের কীভাবে প্রভাবিত করবে তা স্পষ্ট নয়।ফিনওয়াচের জলবায়ু নীতি বিশেষজ্ঞ লাস লেইপোলা বলেছেন, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ইউরোপীয় কোম্পানিগুলির সংগ্রহের চাহিদাকে প্রভাবিত করবে, যা মূল্য শৃঙ্খলে শ্রমিকদের জন্য ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় পরিবর্তন আনবে। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অফ বাংলাদেশের (পিআরআই), অর্থনৈতিক বিভাগের নির্বাহী পরিচালক আহসান মনসুর বলেছেন, ”আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলির দ্বারা আরোপিত নতুন সম্মতির প্রয়োজনীয়তা বিশেষ করে ছোট কারখানাগুলির ওপর ভারী বোঝা চাপাতে পারে। তবে সামগ্রিকভাবে উৎপাদনের পরিমাণ অটোমেশন, ডিজিটালাইজেশন এবং সবুজ সম্মতির জেরে কর্মক্ষেত্রে যে সামগ্রিক ক্ষতি হবে সেই ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করে দেবে।”
কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়া
আইএফসি থেকে অপারেশন অফিসার চৌধুরী বলেন, কোম্পানিগুলোকে তাদের টেকসইতার প্রমাণপত্র দিয়ে ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোকে আকৃষ্ট করতে বিশ্ব বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হবে। তিনি বলেন- ”এর অর্থ হ’ল সবুজ বিনিয়োগ আরও কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারে, যার জন্য দক্ষ শ্রমিক এবং আরও বেশি অর্থ প্রয়োজন।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন- বহুজাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলি বাংলাদেশে সবুজ সংস্কারকে সমর্থন করতে এবং কর্মীদের জন্য আরও ভাল কাজের সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার জন্য তাদের পোশাক বিক্রয়ের একটি ছোট শতাংশ অবদান রাখার মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে একটি বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। ব্র্যান্ড এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির দ্বারা সমর্থিত কিছু বিদ্যমান প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামগুলিও সাহায্য করতে পারে। যেমন H&M নারী কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। পোশাক কারখানার একজন প্রাক্তন শিশু কর্মী নাজমা আক্তার, যিনি বর্তমানে শ্রম অধিকারের পক্ষে সমর্থনকারী আওয়াজ ফাউন্ডেশনের নেতৃত্বে রয়েছেন এবং ইউনাইটেড গার্মেন্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনেরও সভাপতিও বটে। আক্তার জানাচ্ছেন যে ”এই ধরনের প্রোগ্রামগুলি ভাল তবে বেশিরভাগই স্বতন্ত্র প্রচেষ্টা। আগামী চ্যালেঞ্জের জন্য কর্মীদের যথাযথভাবে সজ্জিত করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নীতি এবং একটি যথাযথ দৃষ্টিভঙ্গি দরকার। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের কণ্ঠস্বরকেও গুরুত্ব দিতে হবে। ”লডস ফাউন্ডেশনের সিইও লেসলি জনস্টনের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন হলেও এর প্রভাব থেকে আমরা কিভাবে বাংলাদেশের লক্ষ শ্রমিক ও তাদের পরিবারগুলিকে বাঁচাতে পারি সেদিকে নজর দিতে হবে।
অভিবাসীদের সাহায্য করা
গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ট্রেড ইউনিয়ন সেন্টারের একজন নেতা মঞ্জুর মঈন মনে করেন, ”জীবিকার মজুরি সহ আরও ভালো কর্মসংস্থানের শর্ত ছাড়া সাপ্লাই চেইনে সবুজায়ন খুব বেশি দিন স্থায়ী হতে পারে না।”CEGIS-এর রহমান উল্লেখ করেছেন -অনেক গার্মেন্টস শ্রমিক অভিবাসী যারা ঢাকা এবং এর আশেপাশের এলাকায় চলে গেছে কারণ তাদের নিজ শহরে ভালো চাকরির সুযোগ নেই বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাদের স্থানীয় জীবিকা যেমন কৃষিকাজ নষ্ট হয়ে গেছে। পিআরআই-এর মনসুর বলেন, সাশ্রয়ী মূল্যে শিশু এবং স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং উন্নত আবাসনের ব্যবস্থা করে দিলে শ্রমিকদের সমস্যা অনেকটাই লাঘব হতে পারে। গবেষকরা সতর্ক করেছেন, এমনকি শহুরে এলাকায় যেখানে তারা এখন জীবিকা নির্বাহ করে অদূর ভবিষ্যতে সেই এলাকাও উষ্ণায়নের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কর্নেল ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, জলবায়ু সংক্রান্ত কোনো ব্যবস্থা ছাড়াই ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের পোশাক উৎপাদনকারী এলাকার ৩৫% নিয়মিত বন্যার কবলে পড়তে পারে।বিশেষজ্ঞরা উদীয়মান ঝুঁকির জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছেন। মনসুর বলেন- ”জলবায়ু পরিবর্তনের পটভূমিতে শহরের দরিদ্র এবং শ্রমিক শ্রেণির সমস্যাগুলি সমাধানের জন্য সরকারকে চিন্তা করতে হবে এবং সেইমতো পরিকল্পনা নিতে হবে।”