নতুন বছরের দুই মাস অতিক্রম করেনি। এরই মধ্যে ইসরাইল এবং ইরানের মধ্যে যুদ্ধং দেহী ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। রোববার সকালে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে কয়েকটি ভবনে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এতে ৫ জন নিহত এবং বেশ কিছু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পশ্চিমা দুটি গোয়েন্দা বিষয়ক এজেন্সি বলেছে, এই হামলা চালানো হয়েছে ইরানের শক্তিধর ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) পরিচালিত একটি লজিস্টিক সেন্টারে। জানুয়ারিতে দুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার পর সিরিয়ার রাজধানীতে এই হামলা হয়েছে। ২৮শে জানুয়ারি রাতের বেলা ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে ইরানের ইস্পাহান শহরের কেন্দ্রস্থলে একটি সামরিক স্থাপনাকে টার্গেট করে। এর পরপরই ইরানের একটি ট্রাকবহরে আকাশপথে হামলা চালায় তারা। ওই ট্রাকগুলো ইরাক থেকে সিরিয়ায় প্রবেশ করেছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এসব ছদ্মবেশী হামলার নেপথ্যে আছে ইসরাইল।
অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র আঞ্চলিক মিলিশিয়া, বিশেষ করে লেবাননের হিজবুল্লাহর কাছে হস্তান্তর করছে আইআরজিসি- এমন অভিযোগে তাদেরকে প্রতিরোধ করার জন্য গত এক দশক ধরে আকাশপথে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। সিরিয়ায় যাতে আইআরজিসি তাদের সামরিক ঘাঁটি গাড়তে না পারে সেটাও চেষ্টা করছে ইসরাইল। ২৯শে জানুয়ারি ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী আল কাইম সীমান্ত ক্রসিংয়ে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। ঘন ঘন এই এলাকাকে এমন হামলার টার্গেট করে তারা।
ইরানের ভেতরে ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এমন ছদ্মবেশী হামলা ও স্যাবোটাজ করার অভিযোগ আছে ইসরাইলের বিরুদ্ধে। উপরন্তু তারা ইরানের সিনিয়র পারমাণবিক বিজ্ঞানী মোহসেন ফাখরিজাদেহেকে তেহরানের এক সড়কে ২০২০ সালের নভেম্বরে হত্যা করেছে। অভিযোগ আছে, একটি স্বয়ংক্রিয় স্যাটেলাইট পরিচালিত অস্ত্র দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু ২০২৩ সালে এসে ইসরাইলের হামলা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ থেকে ইঙ্গিত মেলে যে, তারা যে সময়ে ভূরাজনৈতিক অগ্রাধিকার নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে, তখন তারা এই হামলা দ্রুততর এবং তীব্রতর করছে। ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি সম্পাদন হয় যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ে। এই চুক্তি জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন নামে পরিচিত। এর অধীনে ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়। বিনিময়ে ইরান তার ইউরেনিয়াম উৎপাদন কমিয়ে আনে। কিন্তু বারাক ওবামা ক্ষমতা থেকে যাওয়ার পর সাবেক প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ওই চুক্তি বাতিল করেন। জো বাইডেন প্রশাসন এবং তার ইউরোপিয়ান মিত্ররা সর্বোচ্চ চেষ্টা করা সত্ত্বেও এই চুক্তি এখন পর্যন্ত মৃত অবস্থায় আছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি বলেন, ইউরেনিয়াম উৎপাদন তেহরান এতটাই বৃদ্ধি করেছে যে, যদি তারা মনে করে তাহলে তা দিয়ে বেশ কিছু পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনে সক্ষম হবে।
২৪শে জানুয়ারি ইউরোপিয়ান এমপিদেরকে গ্রোসি বলেন, একটি বিষয় খুব সত্য। একটি নয়, বেশ কতোগুলো পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম জড়ো করেছে ইরান। শতকরা ৬০ ভাগ ইউরোনিয়াম আছে এমন ৭০ কিলোগ্রাম ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে তারা। এর অর্থ এই নয় যে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেছে। তারা এখনো তা করেনি। ২০১২ সালে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যে মাত্রার কথা বলেছিলেন এর পরিমাণ তাই। তিনি সম্প্রতি ক্ষমতায় ফিরেছেন। তার সঙ্গে রয়েছে অধিক কট্টরপন্থি ডানরা। তারা ইরান ও বিস্তৃত অঞ্চলে হামলা বৃদ্ধি করেছে। সামনের সময়ে তারা তা আরও বৃদ্ধি করবে বলে মনে হয়। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নেয়ার ইস্ট পলিসির প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং সহযোগী ফেলো ফারজিন নাদিমি বলেন, তারা এ বছরে যে হামলাগুলো চালিয়েছে তা দিয়ে সিরিয়া ও হিজবুল্লাহকে অস্ত্র সহায়তা দেয়া বন্ধ করাতে চাইছে ইরানের কাছে। একই সঙ্গে ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতা অর্জন না করতে পারে তাদের লক্ষ্য তাই। তিনি পূর্বাভাস দেন, এসব হামলা আরও বড় এবং বেশি বেশি হবে।
কারণ, ইরানের শাসকগোষ্ঠী ভবিষ্যতে তাদের পারমাণবিক কর্মকা- দ্রুততর করতে পারে। যেকোনো সময় উত্তেজনা মারাত্মক রূপ নিতে পারে। তাই বলে ২০২৩ সালেই যে ইসরাইল এবং ইরানের মধ্যে পূূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ হতে পারে এ বিষয়ে নিশ্চিত নন নাদিমি। তবে তিনি মনে করেন ২০২৫ সালে তাদের মধ্যে মারাত্মক পর্যায়ে সহিংসতা ঘটতে পারে। তবে নিউ লাইনস ইনস্টিটিউটের স্ট্র্যাটেজিক এবং ইনোভেশন বিষয়ক সিনিয়র পরিচালক নিকোলাস হেরাস বিশ্বাস করেন, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদনের দিকে যায়, তাহলে এই সংঘাত সামরিক যুদ্ধে রূপ নেবে অবশ্যম্ভাবীভাবে।