গত ১৫ই জানুয়ারি গুলশানে একটি বিকাশের দোকানে টাকা লেনদেনকে কেন্দ্র করে গুলির ঘটনা ঘটে। পুলিশ তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে গিয়ে গুলিবর্ষণকারী স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মিন্টুকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পরে তার সঙ্গে থাকা অস্ত্রটি জব্দ করা হয়। অস্ত্রটি বৈধ না অবৈধ তা যাচাই করে দেখে পুলিশ। জানা যায়, মিন্টু তথ্য গোপন করে উপর মহলে তদবিরের মাধ্যমে ২০১৬ সালে অস্ত্রের লাইসেন্সটি পেয়েছিলেন। সেটির মেয়াদ শেষ হয়েছিল ২০২১ সালে। কিন্তু, তিনি নতুন করে নবায়ন করেননি। কেউ নতুন করে নবায়ন না করলে এবং মেয়াদ পার হওয়ার একদিন পর ব্যবহার করা হলেও অবৈধ ব্যবহার হিসাবে দেখা হয়। দেশে এমন মেয়াদোত্তীর্ণ অস্ত্রের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন করে অস্ত্রের নবায়ন না হওয়ার কারণে সেটি হাত-বদলের শঙ্কা রয়েছে।
হাতবদলকারী এটির আবার অবৈধ ব্যবহার করতে পারে বলে ধারণা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর। এতে সমাজে অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে। বিভিন্নস্থানে ঘটছে গুলির ব্যবহার। দুর্বৃত্তরা প্রকাশ্যে অবৈধ অস্ত্র দিয়ে গুলি ছুড়ছে। এতে অনেকেই বিস্মিত হচ্ছেন যে, তার হাতে অস্ত্র এলো কীভাবে। সারা দেশে যে সব ঘটনায় অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে সেই সব অস্ত্র বৈধ কি-না তা অভিযোগ আকারে পুলিশ সদর দপ্তরে জমা পড়েছে। অভিযোগকারীর নাম গোপন রাখছে পুলিশ। যাতে দুর্বৃত্তরা তার কোনো ক্ষতি করতে না পারে। পুলিশ অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছে। এছাড়াও পুলিশ সদর দপ্তর এই সব অস্ত্রের হালনাগাদ তথ্য যাতে আপডেট থাকে এজন্য একটি ডিজিটাল ডাটাবেইজ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। কারও অস্ত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে যাতে দ্রুতই জানা যায় যে, অস্ত্রটি কবে নিবন্ধন নেয়া হয়েছে এবং সেটির আদৌ মেয়াদ আছে কি-নেই। এছাড়াও আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই ডাটাবেজ তৈরি দ্রুতই শেষ করা হবে বলে জানা গেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি হায়দার আলী খান মানবজমিনকে জানান, প্রত্যেকটি ক্রাইম কনফারেন্সে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জন্য তাগিদ দেয়া হয়।’
পুলিশ সদর দপ্তরের ক্রাইম ম্যানেজমেন্টে কর্মরত এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, তাদের কাছে আসা তথ্যগুলো যাচাই বাছাই করা হচ্ছে। এছাড়াও সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে তারা বিষয়টি অবহিত করেছেন।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, যারা অস্ত্রের নিবন্ধন নিয়ে থাকেন তারা অনেকেই সঠিক নিয়ম মানেন না। অনেক ক্ষেত্রেই অনৈতিক কাজে ব্যবহার করছে লাইসেন্সধারীরা। পুলিশ সদর দপ্তরে এ সংক্রান্ত যেসব অভিযোগ জমা পড়েছে সেগুলো খতিয়ে দেখছে পুলিশ। কারণ এই সব অবৈধ অস্ত্র দিয়ে চাঁদাবাজি, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ভয়ভীতি দেখানো, জমিজমার বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার ও পূর্ব-শত্রুতার জেরে ব্যবহার করা হচ্ছে। সূত্র জানায়, সারা দেশে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার ৩১২টি অস্ত্রের নিবন্ধন দেয়া আছে। তবে মাত্র ৪৩ হাজার ৩১২টি অস্ত্রের হালনাগাদ তথ্য পুলিশ সদর দপ্তর, পুলিশের বিশেষ শাখা এসবি এবং সিআইডি’র কাছে রয়েছে। বাকিগুলোর কোনো হালনাগাদ তথ্য নেই। সেগুলো কী নিবন্ধনকৃত ব্যক্তির হাতে রয়েছে না অবৈধভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তা নিয়ে সংশয়ের মধ্যে আছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দীর্ঘদিন সেই অস্ত্রগুলোর হালনাগাদ তথ্য না থাকায় হাতবদল হতে পারে। কেউবা আবার কাউকে ভাড়া হিসেবে ব্যবহার করতে দিতে পারেন। সেগুলোকে দ্রুত হালনাগাদের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ।
সূত্র জানায়, আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার জন্য সরকারের কিছু শর্ত পরিপূর্ণভাবে মানতে হয়। কারও জীবন শঙ্কার মধ্যে থাকলে কেউ আবেদন করতে পারেন। আবেদনকারীর বয়স ৩০ বছর হতে হবে। প্রত্যেক বছরে তাকে ৩ লাখ টাকা সরকারকে রাজস্ব দিতে হবে। এরপর পুলিশের বিশেষ শাখার ভেরিফিকেশন হওয়ার পর তাকে কর্তৃপক্ষ অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে থাকেন।
পুলিশের বিশেষ শাখা ফায়ার আর্মস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম সূত্রে জানা গেছে, অস্ত্রের লাইসেন্স দেয়া হয় জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে পুলিশের কাছে একটি তদন্ত চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়। ঐ চিঠিতে মূল আবেদনকারীর স্থায়ী ঠিকানা সঠিক কি না এবং তিনি লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন কি- তা তদন্ত করে রিপোর্ট জমা দেয়ার নির্দেশনা আসে।
সূত্র জানায়, এক্ষেত্রে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি সংশ্লিষ্টদের ম্যানেজ করে রিপোর্ট নিজেদের পক্ষে নেন। এমন পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে নামের তালিকা ধরে ডাটাবেজ তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। লাইসেন্সকৃত অস্ত্র কেউ অপব্যবহার করছে কি-না তা খতিয়ে দেখতে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কোনো অপরাধী লাইসেন্সকৃত অস্ত্র ব্যবহার করছে কি-না সেটিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।