ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহসহ মোট ছয়টি সিটি করপোরেশন ও বিভিন্ন জেলার জন্ম নিবন্ধনের সার্ভার হ্যাক করে ভুয়া জন্ম সনদ তৈরির ঘটনায় পাচঁজনকে গ্রেফতার করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশেরে (সিএমপির) কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট। গ্রেফতার পাচঁ জনের মধ্যে তিন হ্যাকার রয়েছে।
গ্রেফতারের সময় জালিয়াতির কাজে ব্যবহৃত দুইটি সিপিইউ, দুইটি মনিটর, তিনটি ল্যাপটপ, একটি ট্যাব, একটি প্রিন্টার ও ছয়টি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে।
রোববার (১৯ ফেব্রুয়ারি) নগরের দামপাড়া পুলিশ লাইনে মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলন এ তথ্য জানান কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপকমিশনার (ডিসি) লিয়াকত আলী খান।
গ্রেফতাররা হলেন, চট্টগ্রামের সাগর আহমেদ জোভান (২৩), নড়াইলের শেখ সেজান (২৩), ঢাকার কলাবাগানের মেহেদী হাসান (২৩), সিরাজগঞ্জের শাকিল হোসেন (২৩) এবং গাজীপুরের মাসুদ রানা (২৭)। গ্রেফতার চক্রের মূল হোতা শেখ সেজান। নড়াইল জেলার লোহাগাড়া উপজেলার দিঘালিয়া বাজারে আদনান কম্পিউটার নামে একটি দোকানের মালিক। জোভান ছিল চক্রের চট্টগ্রাম অঞ্চলের মূল ব্যক্তি। মেহেদী হাসান সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সাইয়েন্সের শেষ বর্ষের ছাত্র। শাকিল ও মাসুদ রানাও সার্ভার হ্যাকিংয়ে পারদর্শী।
ডিসি লিয়াকত আলী খান জানান, গ্রেফতাররা জালিয়াতি করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, কুমিল্লা সিটি করপোরেশন, সিলেট সিটি করপোরেশন, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনসহ, ফরিদপুর, বাগেরহাট ও নরসিংদী জেলায় অসংখ্য জন্ম নিবন্ধন সনদ ইস্যু করেছে। যা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চট্টগ্রাম, নড়াইল, ঢাকা, গাজীপুর ও সিরাজগঞ্জে টানা অভিযান চালিয়ে পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ডের সার্ভার থেকে ভুয়া জন্ম নিবন্ধনের ঘটনায় গ্রেফতার পাঁচজন কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটকে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে জানিয়েছেন সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপ কমিশনার (এডিসি) আসিফ মহিউদ্দীন।
তিনি বলেন, গ্রেফতার চক্রের সদস্যরা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের মূল নিয়ন্ত্রণে থাকা সার্ভার হ্যাক করেই জন্ম নিবন্ধনগুলো করা হয়েছে। জন্ম নিবন্ধন অনুমোদনের দুইটা স্তর আছে। একটি নিবন্ধন সহকারীর, আরেকটি জনপ্রতিনিধির। দুই স্তরেই অনুমোদনই তারা দিতে পারতো। কিন্তু মূল অনুমোদন অর্থাৎ রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের অনুমোদনের ক্ষমতা শেখ সেজান নিজের কাছেই রেখেছিল। গত দেড় বছর ধরে সেজানের নেতৃত্বে চক্রটি জন্ম নিবন্ধন জালিয়াতি করে আসছে।
তিনি আরও বলেন, প্রথমে তারা সরাসরি আইডি-পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে করতো। সেই আইডি-পাসওয়ার্ড আবার প্রতি ঘণ্টার জন্য ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার বিনিময়ে সে চক্রের অন্য সদস্যদেরও ব্যবহার করতে দিতো। গত ছয়মাস ধরে কুকি ব্যবহার করে সার্ভার হ্যাক করে জালিয়াতি করে আসছিল। সেই প্রক্রিয়াও আবার বিভিন্নজনের কাছে ভাড়া দিতো। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ছাড়াও ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, কুমিল্লা, সিলেট ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রামের দোহাজারি পৌরসভা ও ফরিদপুর, বাগেরহাট, নরসিংদী জেলায় কয়েক হাজার জন্ম নিবন্ধন সনদ সৃজনের তথ্য পাওয়া গেছে। শেখ সেজান হ্যাকারদের মূল নেতা। সে একজন সাধারণ দোকানি হলেও ওয়েবসাইট তৈরি, সফটওয়্যার ডেভেলপসহ প্রযুক্তিগত বিভিন্ন বিষয়ে তার দক্ষতা আছে। তার দোকানে বসেই সার্ভার হ্যাক করে পাঁচ হাজারের বেশি ভুয়া জন্ম নিবন্ধন করার কথা সে আমাদের কাছে স্বীকার করেছে। বাকি চারজন যারা তারাও কিন্তু হ্যাকিংয়ে পারদর্শী। তবে এদের একেকজন একেক স্তরে কাজ করে। সবাই হ্যাকিংয়ে জড়িত এমন নয়। মূল কাজ করে সেজান।
এদিকে, কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন,গত ৩ জানুয়ারি জন্ম নিবন্ধন সার্ভার সুরক্ষিত করতে নতুনভাবে আপডেট দেওয়া হয়। এতে ওটিপি নম্বর ইনপুট দেওয়ার মাধ্যমে প্রবেশের অপশন যুক্ত করা হয়, যাতে ব্যবহারকারীর মোবাইল নম্বর দেওয়া বাধ্যতামূলক। সেই আপডেটের পরও ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত শেখ সেজানের নেতৃত্বাধীন চক্রটি সার্ভারে প্রবেশ করে জন্ম নিবন্ধন করেছে।
প্রসঙ্গত, গত ২৪ জানুয়ারি চসিক ১৩ নম্বর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের জন্মনিবন্ধন সহকারী আনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে ভুয়া জন্মনিবন্ধনের ঘটনায় খুলশী থানায় মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় গ্রেফতার চারজনের তথ্যের ভিত্তিতে গত ৩০ জানুয়ারি নগরের ডবলমুরিং থানা নির্বাচন কার্যালয়ের অফিস সহায়ক সাময়িক বরখাস্তকৃত জয়নালকে গ্রেফতার করা হয়। গত ২৬ জানুয়ারি বিকেলে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে চসিক জন্মনিবন্ধন সনদ জালিয়াতি চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেফতারের তথ্য জানানো হয়েছিল। এর আগে গত ২৪ জানুয়ারি এক প্রেস ব্রিফিংয়ে চসিকের জন্মনিবন্ধন সনদ জালিয়াতি চক্রের ৪ সদস্যকে গ্রেফতার করে বলে জানায় সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগ।